বুধবার, ১৫ Jul ২০২৬, ০১:৩৬ অপরাহ্ন

‘কিছুদিন নিশ্চিন্তে খেতে পারব’

হুইলচেয়ারের পেছনে দাঁড়ানো নূর উদ্দিন। তাঁর পাশে প্রতিবন্ধী স্ত্রী। কথা বলতে পারেন না। চেয়ারে বসা প্রতিবন্ধী ছেলে। জন্ম থেকেই হাঁটতে পারেন না। বাসায় রেখে এসেছেন জন্মান্ধ মেয়েকে। তিনিও কথা বলতে পারেন না। চার সদস্যের এই পরিবারে তিনজনই প্রতিবন্ধী। নূরউদ্দিন একাই হাল ধরেছেন সংসারের। রিকশাভ্যান চালিয়ে যে আয়-উপার্জন হতো, তা দিয়েই কোনো রকমে কষ্টেসৃষ্টে দিন পার করতেন। এর ওপরও বাগড়া দিয়েছে করোনা। সব মিলিয়ে এখন কোণঠাসা পুরো পরিবার। তাদের কাছে গতকাল সোমবার বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্যরা। ত্রাণ পেয়ে তাদের মুখে ফুটেছে হাসি। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে নূর উদ্দিন বলেন, ‘করোনার মধ্যে ভ্যান চালাতে পারি না। প্রতিবন্ধী পরিবার নিয়ে দুই মুঠো ভাত খেতেও কষ্ট হয়। অসুখ-বিসুখ হলে চিকিৎসা করাতে পারি না। আপনাদের ত্রাণ দিয়ে কিছুদিন নিশ্চিন্তে খেতে পারব।’

শুধু নূর উদ্দিনই নন, গতকাল নীলফামারী সদর, সৈয়দপুর ও জলঢাকা উপজেলায় এক হাজার ১০০ জন প্রতিবন্ধী, পত্রিকা হকার, শ্রমিক ও অতিদরিদ্রের হাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ সহায়তা তুলে দিয়েছে কালের কণ্ঠ শুভসংঘ। তাদের প্রত্যেককে ১০ কেজি চাল, দুই কেজি ডাল, দুই কেজি আটা ও এক লিটার তেল ত্রাণসামগ্রী হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

সকাল ১১টার দিকে সৈয়দপুরে প্রতিবন্ধী মেয়ে মণিকা আক্তারের সঙ্গে ত্রাণ নিতে আসেন শাহনাজ পারভীন। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের মতো ছেলেও জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। হুইলচেয়ারে চলতে হয় সব সময়। খুব কষ্টে সংসার চলছে আমাদের। আপনাদের সাহায্য দিয়ে আমরা কিছুদিন খেতে পারব।’ আমজাদ হোসেন নামের আরেক প্রতিবন্ধী বলেন, ‘আমি কোনো কাজ করতে পারি না। মানুষের সাহায্যের ওপর বেঁচে আছি। তোমরা দিলে খেতে পারি, না দিলে পারি না। তোমাদের জন্য দোয়া করি।’

ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোকসেদুল মোমিন, সৈয়দপুর শুভসংঘের উপদেষ্টা অধ্যক্ষ মো. রেজাউল করিম রেজা, অধ্যক্ষ মো. হাবিবুর রহমান, আনোয়ারুল ইসলাম, সৈয়দপুর উপজেলা শুভসংঘের সভাপতি নাসিম রেজা শাহ্, সহসভাপতি মো. মতিয়ার রহমান, হিল্লোল রায়, সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুন্না দাস, কোষাধ্যক্ষ আব্দুল খালেক, সদস্য আমির হোসেন, অশোক রায় চৌধুরী, শাহনাজ পারভীন, তামিম রহমান, অশোক রায়, মিজবা, রাহি চৌধুরী, সাপ্তাহিক সাফ জবাব পত্রিকার সম্পাদক নজরুল ইসলাম প্রমুখ।

উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, ‘করোনাকালে মানুষ যখন ঘরবন্দি দুঃসময় পার করছে তখন সমাজের কিছু অসহায় মানুষের দুয়ারে গিয়ে খাদ্যদ্রব্য বিতরণ করছে কালের কণ্ঠ শুভসংঘ। বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় তাদের এই মানবিক কাজের জন্য আমাদের আশপাশে হতদরিদ্র মানুষগুলো দুই বেলা খেতে পারছে। নীলফামারী জেলায় তারা তিন হাজার মানুষকে ১০ দিনের খাদ্যদ্রব্য দেবে। আমরা সৈয়দপুরবাসী তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাদের এমন মানবিক কাজ সব সময় চলমান থাকবে সেই প্রত্যাশা করি।’

এর আগে সকালে নীলফামারী সদর ও সৈয়দপুরে পত্রিকা হকারদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়। করোনায় হকারের আয়ও কমে গেছে। ফলে পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা। এদিন সদর উপজেলার মাধার মোড়ের একটি মাঠে এই ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়। এরপর দুপুরে সদর উপজেলার নতুন দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দুই শতাধিক অতিদরিদ্রের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ও বয়স্কদের মধ্যে এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া সবার মধ্যে মাস্ক বিতরণ ও করোনা সুরক্ষায় সচেতনতামূলক পরামর্শ দেওয়া হয়।

দীর্ঘদিন পত্রিকার হকারি করতেন মোবারক হোসেন। তিনি বলেন, ‘এখন আমি কাজ করতে পারি না। বড় ছেলে যে টাকা দেয় তা দিয়েই কষ্টে জীবন চলে। করোনার কারণে বড় ছেলের কাজ নেই। খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে আমার। আপনাদের ত্রাণ দিয়ে কিছুদিন খেতে পারব।’

নছিরন বেগম বলেন, ‘মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা পাই তা দিয়েই সংসার চালাই। করোনার মধ্যে তা-ও করতে পারি না। আমাদের দেখার কেউ নেই। তোমাদের ত্রাণ দিয়ে কিছুদিন খেতে পারব। এরপর কে আমাদের দেখবে জানি না।’

ত্রাণ বিতরণে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান চৌধুরী। তিনি বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘করোনার এই অতিমারিতে বসুন্ধরা গ্রুপ সারা দেশের অসহায়দের ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। তাদের এই মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকুক সেই প্রত্যাশা করি এবং দোয়া করি।’ এ সময় উপস্থিত ছিলেন নীলফামারী পৌর মেয়র দেওয়ান কামাল আহমেদ, সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিদ মাহমুদ, জেলা শুভসংঘের উপদেষ্টা সরওয়ার মানিক, সাধারণ সম্পাদক সালমা আক্তার, কোষাধ্যক্ষ লীনা দে, কুদ্দুস সরকার ও ওমর ফারুক, দীপু রায়, গিরেন রায় প্রমুখ।

এরপর বিকেল ৩টার দিকে জলঢাকা উপজেলায় ৪০০ অসহায় দরিদ্র পরিবারকেও ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়। এ সময় তাদের করোনা সুরক্ষায় সচেতনতামূলক পরামর্শ ও মাস্ক বিতরণ করা হয়। জলঢাকা উপজেলার রাবেয়া চৌধুরী মহিলা ডিগ্রি কলেজ মাঠে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন নীলফামারী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই এই করোনার সংকটময় মুহূর্তে তারা দেশব্যাপী ত্রাণ বিতরণের অংশ হিসেবে জলঢাকার দরিদ্র জনগণকে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে।’

সেখানে ফরিদা বেগম বলেন, ‘স্বামী নাই, ছেলে নাই। মেয়ের বাড়িতে খাই। কোনো রকমে দিন যায়। তোমাদের খাবার দিয়ে কিছুদিন খেতে পারব।’ ত্রাণ পেয়ে হাসিমাখা মুখে বনেশ্বরী দেবী বলেন, ‘ভগবান তোমাদের ভালো করুক, আশীর্বাদ করি তোমরা দুধে-ভাতে থাকো।’

স্বাধীনতার আগে গুণবালার স্বামী মারা গেছেন। থাকেন মেয়ের জামাইয়ের বাসায়। গুণবালা বলেন, ‘বেটা-পুত্র নাই। বয়স্ক ভাতা যা পাই, তা দিয়েই খাই। তোমাদের সাহায্য পাইলে খাই।’

ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন জলঢাকা শুভসংঘের সভাপতি ও রাবেয়া চৌধুরী মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ বিবেকানন্দ মোহন্ত, সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক এম এ শাহিন আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক প্রভাষক পল্লব হোসেন, সদস্য নাহিদ মিথুন প্রমুখ। এসব অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুন, সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, জেলা শুভসংঘের সভাপতি অধ্যক্ষ আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।

সন্ধ্যা ৬টার দিকে জেলা সদরের টুপামারী ইউনিয়নের কিসামত দোগাছি বায়তুল আমানবাগে জান্নাত নুরানি হাফিজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানায় এতিমদের মধ্যে ত্রাণ পৌঁছে দেন শুভসংঘের সদস্যরা। সেখানে করোনা মহামারি থেকে মুক্তি ও বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের জন্য বিশেষ দোয়া করে মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীরা। উপস্থিত ছিলেন মাদরাসার উপদেষ্টা মো. মজিবর রহমান, আবুয়াল হোসেন, সভাপতি আবু সাঈদ, সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম রবি প্রমুখ।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com